চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন, শুল্ক ও প্রযুক্তি যুদ্ধে কোনো পক্ষই বিজয়ী হতে পারে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির বাস্তবায়নে সে কথাই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠতে যাচ্ছে, অন্তত বেইজিংয়ের পাল্টা প্রতিক্রিয়া তা-ই বলছে। চীনের রাষ্ট্র সমর্থিত পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, নতুন মার্কিন আমদানি শুল্কের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। এর অংশ হিসেবে মার্কিন কৃষি রফতানিকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এতে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তেজনা আরো বেড়ে গেছে। খবর রয়টার্স।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে চীনের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। এতে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের হোয়াইট হাউজে প্রবেশের দুই মাসের মধ্যে চীনের ওপর মোট ২০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হচ্ছে। বেইজিংকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল প্রবাহ বন্ধ করতে যথেষ্ট উদ্যোগ না নেয়ার জন্য অভিযুক্ত করেছেন ট্রাম্প, যা চীনের মতে ‘ব্ল্যাকমেইল’-এর শামিল।
সূত্রের বরাত দিয়ে গ্লোবাল টাইমস গতকাল জানিয়েছে, ফেন্টানিলের অজুহাতে চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় চীন প্রাসঙ্গিক পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্লেষণ ও নীতি প্রণয়ন করছে।
এ পাল্টা ব্যবস্থার মধ্যে শুল্ক ছাড়াও বিভিন্ন শুল্ক-বহির্ভূত বাধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মার্কিন কৃষি ও খাদ্যপণ্য সম্ভবত এ তালিকায় থাকবে। তবে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বেইজিংয়ের মার্কিন দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
মার্কিন কৃষিপণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার চীন। খাতটি দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য উত্তেজনার সময় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। অক্সফোর্ড গ্লোবাল সোসাইটির গবেষক জেনিভিভ ডোনেলন-মে বলেন, ‘২০১৮ সাল থেকে আমদানির পরিমাণ কমে গেলেও মার্কিন প্রধান কৃষিপণ্যের (যেমন সয়াবিন, মাংস ও শস্য) ওপর যেকোনো শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। এটি মার্কিন রফতানিকারক ও কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’
তিনি আরো বলেন, ‘দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসন ও বাণিজ্য যুদ্ধ ২.০-এর জন্য প্রস্তুতি নেয়ার সময় পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাত। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকে শিক্ষা নিয়েছে। তত্ত্বগতভাবে এটি বিকল্প বাজার খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে থাকা উচিত। তবে বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল হতে পারে।’
এরই মধ্যে চীনের বাজারে সয়ামিল ও রেপসিড মিল ফিউচার চুক্তি মূল্য ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। শুল্ক বাড়ার আশঙ্কার পাশাপাশি সরবরাহ সংকটের প্রভাব পড়েছে এতে। ডালিয়ান কমোডিটি এক্সচেঞ্জে সয়ামিল চুক্তিমূল্য গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।
বিশ্বের বৃহত্তম কৃষিপণ্য আমদানিকারক ও দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ হাজার ৯২৫ কোটি ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য আমদানি করেছিল দেশটি, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ শতাংশ কম। ২০২৩ সালে পতনের হার ছিল ২০ শতাংশ। অর্থাৎ টানা দুই বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনের কৃষিপণ্য আমদানি কমেছে। শুল্কের প্রভাবে সামনে আরো কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার ফলে বেইজিংয়ের কাছে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়া বা সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য এক সপ্তাহেরও কম সময় ছিল। প্রস্তাবিত শুল্ক বৃদ্ধি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন চীনের বার্ষিক পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরু হচ্ছে। এ অধিবেশনে বেইজিং ২০২৫ সালের জন্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং এখনো ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আপস করতে চায়। তবে লক্ষণ বলছে, অর্থনৈতিক দুই পরাশক্তির মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। পিকিং ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল কো-অপারেশন অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ওয়াং ডং বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ অনিবার্য নয়, তবে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত খারাপ একটি পদক্ষেপ। ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা হয়তো মনে করছেন, এ সময় শুল্ক আরোপ চীনের ওপর চাপ তৈরি করবে এবং একটি বার্তা দেবে। তবে এটি উল্টো ফল দেবে এবং চীন অবশ্যই কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।’
২০১৭-২১ সালে প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্কের কারণে একটি পূর্ণমাত্রার বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, যা আর্থিক বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। এবার ৪ ফেব্রুয়ারি ফেন্টানিল-সম্পর্কিত আমদানি শুল্ক আরোপের মাধ্যমে ট্রাম্পের প্রথম আঘাতের পর চীন দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বেইজিং মার্কিন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সম্প্রতি বিস্তৃত পাল্টা ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গুগল ও ক্যালভিন ক্লেইনের প্যারেন্ট কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়লা, জ্বালানি তেল ও কিছু গাড়ির ওপর নতুন আমদানি শুল্ক।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, তারা যত দ্রুত সম্ভব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ফিরতে চায়। তবে যদি আলোচনা না হয়, তাহলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। চীনের শীর্ষ কমিউনিস্ট পার্টি কর্মকর্তারা ওই এক বৈঠকে অর্থনীতিতে যেকোনো বহিরাগত ঝাঁকুনি ঠেকানোর জন্য পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বৈঠকটি এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হয়, যখন হোয়াইট হাউজ ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বিনিয়োগ নীতিতে চীনকে ‘বিদেশী প্রতিপক্ষ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।